যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্যের কেন্দ্রে উঠে এসেছে রাজধানী লন্ডন

সাধারণ ব্রিটিশদের দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে ভাড়া ও আবাসন ব্যয়ের ব্যাপক উল্লম্ফন

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের হ্যাকনি অঞ্চলের স্ট্যামফোর্ড হিল এলাকা। এখানকার প্রায় শতভাগ শিশুই এখন বড় হচ্ছে দারিদ্র্যপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে।

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের হ্যাকনি অঞ্চলের স্ট্যামফোর্ড হিল এলাকা। এখানকার প্রায় শতভাগ শিশুই এখন বড় হচ্ছে দারিদ্র্যপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এলাকাটিতে দারিদ্র্য প্রকট আকার ধারণ করেছে অবিশ্বাস্য মাত্রায়। ছয় বছর আগেও ২০১৯ সালে স্ট্যামফোর্ড হিলের শিশুদের মধ্যে মাত্র ৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল দরিদ্র পরিবারের সদস্য। বর্তমানে এ এলাকার ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

শুধু স্ট্যামফোর্ড হিল বা হ্যাকনি নয়, গোটা লন্ডনে এখন কমবেশি মাত্রায় এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ভাড়া ও আবাসন ব্যয়ের ব্যাপক উল্লম্ফন লন্ডনের বাসিন্দাদের জীবনযাপনকে মারাত্মক চাপে ফেলে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, এ ছয় বছরে তাদের আয় বেড়েছে সামান্য। কিন্তু ব্যয় বেড়েছে মারাত্মক আকারে। বিশেষ করে আয়ের প্রায় পুরো অংশ চলে যাচ্ছে বাড়ি ভাড়ায়। ফলে জীবনমানের উন্নয়ন দূরের কথা, মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

যুক্তরাজ্যের মিনিস্ট্রি অব হাউজিং, কমিউনিটিজ অ্যান্ড লোকাল গভর্নমেন্ট দেশটিতে দারিদ্র্যের মাত্রা পরিমাপের জন্য নিয়মিত বিরতিতে ‘ইনডিসেস অব মাল্টিপল ডিপ্রাইভেশন’ (আইএমডি) প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এ প্রতিবেদনের ২০২৫ সংস্করণ সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে। এতে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্যের মানচিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে দেশটিতে দারিদ্র্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো উত্তর ইংল্যান্ডের শহর লিভারপুল, ব্ল্যাকপুল ও মিডলসব্রো। কিন্তু ভাড়া ও আবাসন ব্যয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসাব করে দেখা গেছে, লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহর এখন যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্যের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। টাওয়ার হ্যামলেটস, হ্যাকনি, ওয়েস্টমিনস্টার ও হ্যারিংগের মতো লন্ডনের ভেতরের এলাকাগুলোর প্রায় সব শিশু এখন নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে দারিদ্র্যের মানচিত্র পরিবর্তন ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনসংক্রান্ত কর্মসূচিগুলোকে কার্যত অকার্যকর করে তুলেছে। এছাড়া এর সামাজিক প্রভাবও বেশ গভীর। ব্রিটিশ সরকারের কল্যাণ ব্যবস্থা ও শিশু সহায়তা পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা এখন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে লন্ডনে। এতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীও ক্রমে চাপে পড়ছে। একদিকে আবাসনের চাহিদা ও ভাড়া বাড়ায় খরচ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সাশ্রয়ী আবাসনের অভাবে তৈরি হচ্ছে নতুন দরিদ্র শ্রেণী।

লন্ডনের স্থানীয় প্রশাসনগুলো বলছে, এ দারিদ্র্যকে এখন শুধু কর্মসংস্থান বা শিক্ষা খাতের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে আবাসন ব্যয়ের ফাঁদে আটকে পড়া অর্থনৈতিক বাস্তবতা হিসেবেও দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ এ সূচক প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাজ্যে সামাজিক বৈষম্য ও স্থানীয় অর্থনীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ফলাফল প্রমাণ করছে যে যুক্তরাজ্যে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে সরকারের নেয়া কর্মসূচি বাস্তবে খুব একটা সফল হয়নি।

অর্থনীতির বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবাসন খরচের পাশাপাশি সরকারের জনকল্যাণনীতির সীমাবদ্ধতা যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্যের চক্রকে আরো জটিল করেছে। দুই সন্তানের পর ভাতা না দেয়া এবং বাড়ি ভাড়ার সহায়তা কমে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে লন্ডন ও আশপাশের এলাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। লন্ডনে ক্রমবর্ধমান আবাসন খরচ এখন ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থনীতির ভারসাম্যেও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্রিটিশ সরকারের দারিদ্র্য সূচক স্থানীয় সরকার ও ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) বাজেট বণ্টনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ অবস্থায় প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর দেশটিতে আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, লন্ডনের কাউন্সিলগুলোয় এখন সরকারের তহবিল বরাদ্দ বেড়ে যেতে পারে। আর এর বিপরীতে কমতে পারে ইংল্যান্ডের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের শহরগুলোয়। চলতি নভেম্বরেই ব্রিটিশ সরকারের স্থানীয় সরকারের অর্থায়নসংক্রান্ত নতুন নীতি প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। এ নীতি প্রকাশের পর দেশটিতে আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে বিতর্ক আরো জটিল রূপ পেতে পারে।

এছাড়া এ ধরনের তহবিল বরাদ্দভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, লন্ডনের মতো শহরে যেখানে মধ্যম আয়ের পরিবারকেও ভাড়ার চাপে নিম্ন আয় স্তরে নেমে যেতে হচ্ছে, সেখানে কেবল আর্থিক বরাদ্দ নয়, প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার। যতক্ষণ না আবাসন খরচ নিয়ন্ত্রণ ও কল্যাণনীতির পুনর্গঠন করা হচ্ছে, ততক্ষণ এখানে আর কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান এনে দিতে পারবে না।

লন্ডনের কেন্দ্রে উঠে এলেও দারিদ্র্য ও শিশু দারিদ্র্য এখন গোটা যুক্তরাজ্যেই মারাত্মক উদ্বেগ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে ২০১৯ সালের সূচকে গোটা যুক্তরাজ্যে কোনো এলাকায় শিশু দারিদ্র্যের হার ৯০ শতাংশ ছাড়ায়নি। কিন্তু এবারের সমীক্ষা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যজুড়ে অন্তত ২৮০টি পাড়া বা ছোট এলাকায় ৯০ শতাংশেরও বেশি শিশু দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এর মধ্যে ৭৩টিতে ৯৯ শতাংশেরও বেশি শিশু দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী পরিবারের সদস্য।

সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা হিসেবে চতুর্থবারের মতো তালিকার শীর্ষে রয়েছে এসেক্সের ক্ল্যাকটনের জেইউইক গ্রাম। এছাড়া ইংল্যান্ডজুড়ে শীর্ষ দরিদ্র এলাকার মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাকপুল, মিডলসব্রো, বার্নলি, ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহাম।

এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের মিনিস্টার ফর লোকাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড হোমলেসনেস অ্যালিসন ম্যাকগোভার্ন বলেন, ‘আজকের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে বহু কমিউনিটি এখন ভেঙে পড়ার মুখে রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন আর্থিক সংকটে দিন পার করছে। আর এ কারণে সেবা কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।’

তিনি আরো বলেন, ‘ব্রিটিশ সরকার সম্প্রতি শিশু উন্নয়ন তহবিলে ৫০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি সংকট মোকাবেলার জন্য রাখা হয়েছে আরো ১০০ কোটি পাউন্ড। এসব পদক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে সহায়ক হবে।’

আরও